এস এম কামরুজ্জামান সাগর , নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট: মৃত্যুবার্ষিকীর আজকের এই দিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত প্রথম জাতীয় পতাকার অন্যতম রূপকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাশকে। ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে যে তরুণদের হাত ধরে একটি জাতির স্বপ্নের প্রতীক তৈরি হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য।
১৯৭০ সালের জুন মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ১০৮ নম্বর কক্ষে এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ও তৎকালীন ছাত্রনেতাদের পরিকল্পনায় শিব নারায়ণ দাশ সেই পতাকার মাঝখানে সোনালি রঙের মানচিত্রটি এঁকেছিলেন।
সবুজ আয়তক্ষেত্রের মাঝে লাল বৃত্ত, আর সেই বৃত্তের ভেতর সোনালি মানচিত্র- এই নকশাটিই প্রথম উত্তোলিত হয়েছিল ২রা মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশে। সেই মানচিত্রখচিত পতাকাটিই ছিল সাত কোটি বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার দৃশ্যমান অঙ্গীকার।
পতাকা তৈরির সেই রাতটি ছিল প্রচণ্ড উত্তেজনার। কামরুল আলমের দর্জি দোকানে কাপড় সেলাইয়ের পর দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে মেঝেতে মানচিত্রের রেখা টেনেছিলেন তিনি। শিব নারায়ণ দাশের সেই সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল পতাকার ক্যানভাসে। যদিও পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর শিল্পী কামরুল হাসানের পরিমার্জিত নকশায় মানচিত্রটি সরিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু শিব নারায়ণ দাশের সেই আদি নকশাটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
শিব নারায়ণ দাশ কেবল একজন নকশাকারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আজীবন এক লড়াকু মানুষ। কুমিল্লার সন্তান শিব নারায়ণ ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। তার বাবা সতীশ্চন্দ্র দাশকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হ/ত্যা করে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা এবং প্রচারবিমুখ। রাষ্ট্রীয় অনেক সুযোগ-সুবিধা বা স্বীকৃতির মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশপ্রেমের বিনিময় হয় না।
আজকের বাংলাদেশের পতাকার যে লাল-সবুজ দিগন্ত বিস্তৃত, তার প্রথম কারিগর হিসেবে শিব নারায়ণ দাশ ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তার জীবন এক পরম শিক্ষা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে নীরবে-নিভৃতে দেশের জন্য কাজ করে যেতে হয়।
লাল-সবুজের এই কারিগরের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
Reporter Name 
















