অস্টেলিয়া ০৮:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
রঘু রাই: ইতিহাসের সাক্ষী ও এক অবিনশ্বর লেন্সের কারিগর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আব্দুল আলীম স্মৃতি পরিষদ গঠিত হাতিরঝিলে জমজমাট আয়োজনে শেষ হলো ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ রান সিজন-২’ বাংলাদেশের উন্নয়নে কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা- মোঃ সাইদ হাসান সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি)-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন তফসিল ঘোষণা লাল-সবুজের প্রথম নকশাকার: শিব নারায়ণ দাশের স্মরণে গীতিকবিতায় অনন্য অবদান: স্বাধীনতার মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি তিন ক্যাটাগরিতে ISO সনদ পেয়ে নজির তৈরি করলো হামদর্দ বাংলাদেশ মুজিবনগর দিবস: এক অমর ইতিহাসের মহাকাব্য জ্বালানি সংকটের বিকল্প সমাধান ম্যাস গ্লোবাল সলিউশনসের চার মডেলের ই–বাইক বাজারে

রঘু রাই: ইতিহাসের সাক্ষী ও এক অবিনশ্বর লেন্সের কারিগর

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৪৮:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ৮ Time View
11

এস এম কামরুজ্জামান সাগর, নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

১৯৭১ সালে যখন পূর্ব বাংলার আকাশ-বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল, যখন লাখো মানুষ প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিল-তখন সেই মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তগুলোকে বিশ্ববিবেকের দরবারে পৌঁছে দিতে যারা কলম বা ক্যামেরা ধরেছিলেন, রঘু রাই ছিলেন তাঁদের অগ্রগণ্য। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ কেবল একটি যুগের অবসান নয়, বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হারিয়ে যাওয়া।

রঘু রাই তখন ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হলে তিনি কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ থাকেননি। জীবন বাজি রেখে তিনি ছুটে গিয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে, ঘুরে বেরিয়েছেন শরণার্থীদের জরাজীর্ণ শিবিরে।

তাঁর তোলা আলোকচিত্রগুলো কেবল স্থিরচিত্র ছিল না; সেগুলো ছিল একেকটি আর্তনাদ। কাদার ওপর দিয়ে হেঁটে আসা ক্লান্ত শরণার্থী মা, ক্ষুধার্ত শিশুর চোখের ভাষা কিংবা পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার চিহ্ন- তাঁর লেন্স এই প্রতিটি আবেগকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধরে রেখেছিল। রঘু রাইয়ের ছবিগুলো সেই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে বিশ্ববাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রঘু রাইয়ের ক্যামেরার অন্যতম সার্থকতা ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের যে ঐতিহাসিক দৃশ্য আমরা দেখি, তার একটি বড় অংশ তাঁর লেন্সেরই ফসল। একটি জাতির জন্মলগ্নের সেই চরম মুহূর্তটিকে তিনি ফ্রেমবন্দী করে অমর করে রেখেছেন। তাঁর তোলা ছবিগুলো ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল ইতিহাস কল্পনা করা অসম্ভব।

কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালেই ভারত সরকার তাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত করে। রঘু রাই বিশ্বাস করতেন, আলোকচিত্র কেবল একটি কারিগরি দক্ষতা নয়, বরং এটি হলো মানুষের আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। তিনি বলতেন- “একটি ছবি তখনই সার্থক হয়, যখন সেটি হাজার বছরের নীরবতাকে ভেঙে কথা বলতে শুরু করে।”

রঘু রাই আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কয়েক হাজার নেগেটিভ ও আলোকচিত্র বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। যতদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা আলোচিত হবে, যতদিন সেই বীরত্বগাথা ও ত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম পড়বে, ততদিন রঘু রাই বেঁচে থাকবেন তাঁর ক্যামেরার ক্লিক আর সেই সাদাকালো ফ্রেমে ধরা পড়া অমর মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে।

একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশ তাঁর কাছে চিরঋণী। বিদায়, ইতিহাসের এই মহান সারথি।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রঘু রাই: ইতিহাসের সাক্ষী ও এক অবিনশ্বর লেন্সের কারিগর

রঘু রাই: ইতিহাসের সাক্ষী ও এক অবিনশ্বর লেন্সের কারিগর

Update Time : ০৬:৪৮:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
11

এস এম কামরুজ্জামান সাগর, নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

১৯৭১ সালে যখন পূর্ব বাংলার আকাশ-বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল, যখন লাখো মানুষ প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিল-তখন সেই মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তগুলোকে বিশ্ববিবেকের দরবারে পৌঁছে দিতে যারা কলম বা ক্যামেরা ধরেছিলেন, রঘু রাই ছিলেন তাঁদের অগ্রগণ্য। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ কেবল একটি যুগের অবসান নয়, বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হারিয়ে যাওয়া।

রঘু রাই তখন ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হলে তিনি কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ থাকেননি। জীবন বাজি রেখে তিনি ছুটে গিয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে, ঘুরে বেরিয়েছেন শরণার্থীদের জরাজীর্ণ শিবিরে।

তাঁর তোলা আলোকচিত্রগুলো কেবল স্থিরচিত্র ছিল না; সেগুলো ছিল একেকটি আর্তনাদ। কাদার ওপর দিয়ে হেঁটে আসা ক্লান্ত শরণার্থী মা, ক্ষুধার্ত শিশুর চোখের ভাষা কিংবা পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার চিহ্ন- তাঁর লেন্স এই প্রতিটি আবেগকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধরে রেখেছিল। রঘু রাইয়ের ছবিগুলো সেই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে বিশ্ববাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রঘু রাইয়ের ক্যামেরার অন্যতম সার্থকতা ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের যে ঐতিহাসিক দৃশ্য আমরা দেখি, তার একটি বড় অংশ তাঁর লেন্সেরই ফসল। একটি জাতির জন্মলগ্নের সেই চরম মুহূর্তটিকে তিনি ফ্রেমবন্দী করে অমর করে রেখেছেন। তাঁর তোলা ছবিগুলো ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল ইতিহাস কল্পনা করা অসম্ভব।

কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালেই ভারত সরকার তাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত করে। রঘু রাই বিশ্বাস করতেন, আলোকচিত্র কেবল একটি কারিগরি দক্ষতা নয়, বরং এটি হলো মানুষের আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। তিনি বলতেন- “একটি ছবি তখনই সার্থক হয়, যখন সেটি হাজার বছরের নীরবতাকে ভেঙে কথা বলতে শুরু করে।”

রঘু রাই আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কয়েক হাজার নেগেটিভ ও আলোকচিত্র বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। যতদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা আলোচিত হবে, যতদিন সেই বীরত্বগাথা ও ত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম পড়বে, ততদিন রঘু রাই বেঁচে থাকবেন তাঁর ক্যামেরার ক্লিক আর সেই সাদাকালো ফ্রেমে ধরা পড়া অমর মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে।

একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশ তাঁর কাছে চিরঋণী। বিদায়, ইতিহাসের এই মহান সারথি।