এস এম কামরুজ্জামান সাগর, নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।
১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর ও গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং মা-বোনের সম্ভ্রমহানির হাত থেকে বাঁচতে ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। চুকনগর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইছামতী নদী হয়ে ভারতে যাওয়ার একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট বা সংযোগস্থল ছিল। ফলে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আশায় হাজার হাজার শরণার্থী এসে জড়ো হতে থাকেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর বাজারে।
১৯৭১ সালের ১৯ মে রাত থেকেই চুকনগরের কাঁচাবাজার, ধানহাটা, ফুটবল মাঠ, মালতিয়া মোড় এবং ভদ্রা নদীর পাড়ে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। চারিদিকে শুধু আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের ভিড়—যাঁদের সিংহভাগই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরীহ আবালবৃদ্ধবনিতা। এক বুক আশা নিয়ে তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, ভোর হলেই সীমান্ত পেরিয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাবেন। কিন্তু সেই ভোর তাঁদের জীবনে নিয়ে এসেছিল অন্তহীন অন্ধকার।
১৯৭১ সালের ২০ মে, বৃহস্পতিবার। ঘড়িতে তখন সকাল আনুমানিক ১০টা কিংবা সাড়ে ১০টা। চুকনগর বাজারে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষগুলো যখন একটু রান্নাবান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই যমদূতের মতো ধেয়ে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল। জিপ ও ট্রাকে করে আসা এক প্লাটুন সৈন্য কাঁচাবাজারের পাশেই অবস্থান নেয়।
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় নারকীয় তান্ডব। অত্যাধুনিক হালকা মেশিনগান ও থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে শরণার্থীদের ওপর নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা।
বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা বুলেটের আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে চুকনগর বাজারটি এক জীবন্ত কসাইখানায় পরিণত হয়। যে যেখানে ছিলেন, সেখানেই লুটিয়ে পড়েন। নিমেষেই লাশের স্তূপ!
জীবন বাঁচাতে শত শত মানুষ ভদ্রা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু সেখানেও তাঁদের রেহাই মেলেনি। নদীর পানিতে ভাসমান মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মানুষের রক্তে ভদ্রা নদীর পানি একদম লাল হয়ে গিয়েছিল।
মায়ের বুকে গুলি লেগে স্তন্যপায়ী শিশু ছিটকে পড়েছে, স্ত্রীর চোখের সামনে স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অজস্র মর্মস্পর্শী ঘটনার সাক্ষী চুকনগর। এ যেনো এক স্তব্ধ মানবতা।
দুপুর ৩টা নাগাদ চলে এই তাণ্ডব। মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার ব্যবধানে চুকনগরের মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার নিরীহ মানুষ।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক বড় বড় গণহত্যার কথা আমরা জানি, কিন্তু সময় ও নিহতের সংখ্যার অনুপাত বিবেচনা করলে চুকনগর গণহত্যা এক পৈশাচিক রেকর্ড গড়েছে।
চুকনগর গণহত্যাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের—এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসের—সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে সংঘটিত বৃহত্তম একক গণহত্যা (Largest single massacre in the shortest time) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা হামলা বাদ দিলে, প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এত বিশাল সংখ্যক মানুষকে পৃথিবীর আর কোথাও এভাবে একসাথে হত্যা করা হয়নি। যুদ্ধের পর চুকনগরের ভদ্রা নদী ও তার আশেপাশের চরে শুধু গলিত লাশের স্তূপ ছিল। স্থানীয় মানুষ ও মুটে-মজুররা দিনের পর দিন ধরে সেই লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ মাটি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা বা সময় কোনোটিই ছিল না।
বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে চুকনগরের মানুষের আত্মত্যাগ এক বিশাল ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ইতিহাসের পাতায় যেভাবে চুকনগর গণহত্যার গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, দীর্ঘ সময় তা উপেক্ষিত থেকেছে।
চুকনগর গণহত্যা শুধু বাংলাদেশের নিজস্ব ট্র্যাজেডি নয়, এটি বিশ্ব মানবতার ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। বিশ্বকে জানানো উচিত, বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য কী পরিমাণ মূল্য চুকিয়েছে।
চুকনগরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ (চুকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ) নির্মিত হলেও, পুরো চুকনগর জুড়েই ছড়িয়ে আছে অজস্র গণকবর। এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও বড় পরিসরে সংরক্ষণ করা জরুরি। আমাদের নতুন প্রজন্মকে চুকনগরের ইতিহাস জানাতে হবে, যাতে তারা স্বাধীনতার পেছনের ত্যাগ ও কষ্টের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে।
চুকনগর গণহত্যা কেবল একটি সংখ্যার ট্র্যাজেডি নয়; এটি ছিল একটি স্বাধীনতাকামী জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পাকিস্তানি নীলনকশার অংশ। আজ ২০ মে, এই ঐতিহাসিক দিবসে চুকনগরের সেই ১০-১২ হাজার নাম না জানা শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। চুকনগরের রক্তভেজা মাটি যেন আমাদের সবসময় মনে করিয়ে দেয়—আমাদের এই স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়, এটি লাখো প্রাণের বিনিময়ে কেনা এক পরম অধিকার।
Reporter Name 








