মোহাম্মদ আলিম উল্লাহ :
বারবার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির দাম বৃদ্ধি করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি আয় বাড়ানোর জন্য বিকল্প ও আরও কার্যকর পথ নিয়ে যথেষ্ট ভাবছে?
শুধু যানবাহন খাত থেকেই একটি বিশাল পরিমাণ রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে—যদি নীতিমালা বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়।
১. প্রাইভেট গাড়ি
বাংলাদেশে আনুমানিক ৬ লক্ষ প্রাইভেট গাড়ি রয়েছে। যদি প্রতিটি গাড়ির বাৎসরিক ট্যাক্স গড়ে ২৫,০০০ টাকা ধরা হয়, তবে সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়ায় প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা।
২. বাস ও ট্রাক
আনুমানিক ২ লক্ষ বাস ও ট্রাক রয়েছে। যেহেতু এগুলো ভাড়াভিত্তিক ও আয়-উৎপাদনকারী যান, তাই এদের ট্যাক্স প্রাইভেট গাড়ির তুলনায় বেশি হওয়া যৌক্তিক। গড়ে ২৫,০০০ টাকা বা তার বেশি হিসাব ধরলে সম্ভাব্য রাজস্ব প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
৩. মোটরসাইকেল
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ লক্ষ মোটরসাইকেল রয়েছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর বাৎসরিক ট্যাক্স কাঠামো সীমিত।
একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো হতে পারে:
* ১১০ সিসি পর্যন্ত: স্বল্প ট্যাক্স
* ১১০ সিসির উপরে: তুলনামূলক বেশি ট্যাক্স
গড়ে প্রতি মোটরসাইকেলে মাত্র ২,৫০০ টাকা হিসাব ধরলেও সম্ভাব্য বাৎসরিক রাজস্ব দাঁড়ায় প্রায় ১,২৫০ কোটি টাকা।
৪. সাইকেল
দেশে আনুমানিক ১.৫ কোটি সাইকেল রয়েছে। সাধারণ মানুষের পরিবেশবান্ধব যাতায়াত উৎসাহিত করতে ব্যক্তিগত সাইকেল ট্যাক্সমুক্ত রাখা উচিত।
তবে ডেলিভারি বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত আনুমানিক ১ লক্ষ সাইকেল যদি বাৎসরিক ১,৫০০ টাকা ট্যাক্সের আওতায় আসে, তবে সম্ভাব্য রাজস্ব প্রায় ১৫ কোটি টাকা হতে পারে।
৫. ভ্যানগাড়ি
আনুমানিক ২০ লক্ষ ভ্যানগাড়ি জীবিকা ও আয়ভিত্তিক পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। যদি বাৎসরিক ৫,০০০ টাকা ট্যাক্স ধরা হয়, তবে সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়ায় প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা।
৬. সিএনজি
দেশে আনুমানিক ৩.৫ লক্ষ সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। প্রতি সিএনজিতে বছরে ১২,০০০ টাকা ট্যাক্স ধরা হলে সম্ভাব্য আয় প্রায় ৪২০ কোটি টাকা।
৭. ব্যাটারিচালিত রিকশা
প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতি ইউনিটে বাৎসরিক ২,৫০০ টাকা ট্যাক্স আরোপ করলে সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়াতে পারে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা।
৮. সাধারণ রিকশা
প্রায় ১০ লক্ষ সাধারণ রিকশা যদি বছরে ২,০০০ টাকা ট্যাক্সের আওতায় আসে, তাহলে সম্ভাব্য আয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
৯. ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও জরিমানা
যদি দেশের আনুমানিক ১ কোটি ২০ লক্ষ যানবাহনের মাত্র ৫% প্রতিদিন আইন লঙ্ঘন করে, এবং গড়ে ১,০০০ টাকা জরিমানা হয়, তবে:
* দৈনিক সম্ভাব্য রাজস্ব: প্রায় ৬০ কোটি টাকা
* বাৎসরিক (৩০০ কার্যদিবস ধরে): প্রায় ১৮,০০০ কোটি টাকা
মূল প্রশ্ন
যানবাহন খাতেই যদি হাজার হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব থাকে, তাহলে কেন বারবার বিদ্যুৎ ও পানির মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষকে চাপের মধ্যে ফেলা হয়?
রাষ্ট্রের উচিত—
দুর্নীতি কমানো, কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করা, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করা এবং আয়ভিত্তিক ন্যায্য কর কাঠামো গড়ে তোলা।
আমি ধাপে ধাপে পানি খাত, বিদ্যুৎ খাত, এবং অন্যান্য সেক্টরের আয় ও দুর্নীতির সম্ভাব্য চিত্র নিয়েও লিখবো—যাতে অন্তত আলোচনাটা তথ্যভিত্তিক হয়।
“চাপ বাড়িয়ে নয়, সুশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের আয় বাড়ানো সম্ভব।”
লেখক: বিশিষ্ট চলচ্চিত্র প্রযোজক ও কলামিস্ট
Reporter Name 








